কাজী নাঈম উদ্দিন, লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি:
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মোল্লাহাট গরু বাজারকে কেন্দ্র করে সরকারি রাজস্ব আদায়ের নামে নজিরবিহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহশিলদার আব্দুস সাত্তারের বিরুদ্ধে।
সরকারি নিয়ম নীতি তোয়াক্কা না করে কাঁচা রশিদ, ক্রমিক নম্বরের জালিয়াতি এবং কম্পিউটার প্রিন্টের সাধারণ টোকেন ব্যবহার করে প্রতি হাটে বিপুল অঙ্কের হাসিল তুলে আত্মসাত করা করার অভিযোগ রয়েছে
অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ফেব্রুয়ারি মাসে মোল্লাহাট গরু বাজারের ইজারা মূল্য ৬৫ লাখ টাকা নির্ধারণ করে দরপত্র আহ্বান করা হয়। সেখানে মনির হোসেন নামের এক ব্যক্তি সর্বোচ্চ দরদাতা নির্বাচিত হলেও উপজেলা প্রশাসন আদালতের নিষেধাজ্ঞার অজুহাতে ইজারা প্রক্রিয়া স্থগিত করে। পরবর্তীতে বাজারটি থেকে খাস আদায়ের সরকারি দায়িত্ব দেওয়া হয় তহশিলদার আব্দুস সাত্তারকে। আর এই সুযোগেই বাজারের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যায় ওই ভূমি কর্মকর্তা এবং তাঁর নিজস্ব একটি চক্রের হাতে।
শুরু থেকেই অভিযোগ ছিল, তহশিলদারের স্বাক্ষরিত কাঁচা রশিদে বাজারের হাসিল আদায় করা হচ্ছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী রশিদে ইনডেন্ট নম্বর, সিলমোহর, মৌজা বা খতিয়ানের তথ্য থাকার কথা থাকলেও এই রশিদে তার কিছুই নেই।
সর্বশেষ গত শনিবার (১৬ মে) সরেজমিনে বাজারে গিয়ে দেখা যায় আরও ভয়াবহ চিত্র। হাসিল আদায়ের জন্য বাজারে বসানো চারটি চৌকিতে সরকারি কোনো রশিদের পরিবর্তে ব্যবহার করা হচ্ছে কম্পিউটার থেকে প্রিন্ট করা সাধারণ কাগজের টোকেন। যার একপাশে ক্রেতা টোকেন এবং অন্যপাশে ‘সংরক্ষিত টোকেন’ লেখা রয়েছে।
টোকেনগুলোর নম্বর বণ্টনে দেখা গেছে চরম ধোঁয়াশা ও জালিয়াতির ছাপ। নিয়ম অনুযায়ী প্রথম কক্ষে ০১-১০০, দ্বিতীয় কক্ষে ১০১-২০০, এবং তৃতীয় কক্ষে ২০১-৩০০ ক্রমিক নম্বর থাকার কথা থাকলেও, বাস্তবে কোনো কোনো কক্ষে ক্রমিক নম্বর ০১ থেকে ১৮৭ পর্যন্ত চলে গেছে। অথচ অন্য কক্ষে আবার ১০১-২০০ নম্বর দেওয়া আছে। এতে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, একই টোকেন নম্বর জালিয়াতি করে দ্বিতীয়বার ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব টোকেনে সরকারি রাজস্ব আদায়ের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক চিহ্ন বা সিল নেই।
বাজারের প্রথম চৌকিতে জালিয়াতির তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ করতে গেলে সেখানে দায়িত্বরত ব্যক্তিরা তড়িঘড়ি করে টোকেন নম্বর পরিবর্তন ও ঘষামাজা করার চেষ্টা করে। এ বিষয়ে উপস্থিত সাংবাদিকরা তহশিলদার আব্দুস সাত্তারের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত হন এবং গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে চরম দুর্ব্যবহার করেন।
কাঁচা রশিদ, সিলমোহর বিহীন টোকেন এবং নম্বর ঘষামাজার কারণ জানতে চাইলে তিনি ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, আপনারা ইউএনও’র সাথে কথা বলেন। এরপরই তিনি তাঁর পেটুয়া বাহিনীকে নির্দেশ দিয়ে বলেন, এখানে যত সাংবাদিক আসছে, সবার ছবি ও ভিডিও করো। এ সময় তিনি তাঁর বাহিনী দিয়ে সাংবাদিকদের অবরুদ্ধ করে একটি কৃত্রিম `মব` বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা চালান।
ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, প্রতি হাটবারে এই বাজারে প্রায় এক হাজার গরু ক্রয়-বিক্রয় হয়। সরকারি নির্ধারিত হারের তোয়াক্কা না করে এখানে প্রতিটি গরু থেকে ২ হাজার টাকা এবং ছাগল থেকে ৫০০ টাকা করে হাসিল আদায় করা হচ্ছে, যা নির্ধারিত হারের চেয়ে বহুগুণ বেশি। এই হিসাবে প্রতি সপ্তাহে বাজারটি থেকে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা হাসিল উঠলেও তার সিংহভাগই সরকারি কোষাগারে না গিয়ে তহশিলদার ও তাঁর সিন্ডিকেটের পকেটে যাচ্ছে।
সাংবাদিকদের কাছে থাকা ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, সাদা কাঁচা রশিদ ছাড়াও সরাসরি নগদ টাকা গ্রহণ করছেন তহশিলদার আব্দুস সাত্তার নিজে। এছাড়া একাধিক টোকেনে ক্রমিক নম্বর ঘষামাজা ও পরিবর্তনের লাইভ ফুটেজও গণমাধ্যমকর্মীদের ক্যামেরায় ধরা পড়েছে।
দৈনিক সকালের সময়-এর সূত্রমতে, তহশিলদার আব্দুস সাত্তারের বিরুদ্ধে এটাই প্রথম অপরাধ নয়। তাঁর বিরুদ্ধে দালাল চক্রের মাধ্যমে ভূমি অফিসের প্রতি ফাইল থেকে ৮ হাজার থেকে ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে। এমনকি নালিশী ভূমি মামলার তদন্ত রিপোর্টের জন্যও তিনি ৫০০ টাকা থেকে শুরু করে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত দাবি করেন বলে ভুক্তভোগী মহলে গুঞ্জন রয়েছে।
এ বিষয়ে রায়পুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মেহেদী হাসান কাওছার-এর সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, আসলে স্থানীয়ভাবে সেখানে কি ঘটেছে তা আমি এখনো বিস্তারিত জানি না। তবে বিষয়টি নিয়ে দ্রুত খোঁজখবর নেওয়া হবে এবং তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সরকারি রাজস্বের এমন প্রকাশ্য হরিলুট এবং সাংবাদিকদের সাথে সরকারি কর্মকর্তার এমন আচরণের বিচার চেয়ে জেলা প্রশাসকের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল ও সাধারণ ব্যবসায়ীরা।