অনলাইন ডেস্ক
দীর্ঘ প্রতীক্ষা, এক দশকের প্রস্তুতি এবং জটিল কারিগরি ধাপ পেরিয়ে দেশের জ্বালানি খাতে এক ঐতিহাসিক মুহূর্তের মুখোমুখি বাংলাদেশ। মঙ্গলবার (২৮ এপ্রিল) বিকাল থেকে পাবনার ঈশ্বরদীর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিং এবং ফিজিক্যাল স্টার্টআপ কার্যক্রম শুরু হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনের চূড়ান্ত ধাপে প্রবেশ করবে।
এই কার্যক্রম শুরুকে শুধু একটি প্রযুক্তিগত অগ্রগতি নয়, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ উৎপাদনের বহুমুখীকরণ এবং উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর সক্ষমতার নতুন অধ্যায় হিসেবেও দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জ্বালানি লোডিংয়ের মধ্য দিয়ে ‘ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি’ বা নিয়ন্ত্রিত পারমাণবিক বিক্রিয়ার পথে যাত্রা শুরু হবে, যা পরমাণু বিদ্যুৎ উৎপাদনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোর একটি।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, জ্বালানি লোডিং ঘিরে সব ধরনের নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। বাংলাদেশ ও রাশিয়ার উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা ইতোমধ্যে রূপপুরে পৌঁছেছেন। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ, রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পারমাণবিক সংস্থা রোসাটমের মহাপরিচালক আলেক্সি লিখাচেভসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন বলেছেন, “জ্বালানি লোডিংয়ের মাধ্যমে প্রকল্পের উৎপাদন প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।” তিনি জানান, এই ধাপ শেষ করতে ৩০ থেকে ৪৫ দিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে। এরপর ধাপে ধাপে বিভিন্ন নিরাপত্তা যাচাই ও রিঅ্যাক্টরের সক্ষমতা পরীক্ষা সম্পন্ন হবে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, জ্বালানি লোডিংয়ের পর প্রায় ৩৪ দিন ফিজিক্যাল স্টার্টআপ এবং চেইন রিঅ্যাকশন সংক্রান্ত পরীক্ষা চলবে। এরপর রিঅ্যাক্টরের সক্ষমতা ধাপে ধাপে ৩, ৫, ১০, ২০ ও ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হবে। এই পর্যায়ে পৌঁছালে জাতীয় গ্রিডে প্রথমবার বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু হতে পারে। সংশ্লিষ্টদের আশা, আগস্টের প্রথম সপ্তাহে পরীক্ষামূলকভাবে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হতে পারে।
চলতি বছরের শেষ কিংবা আগামী বছরের শুরুতে প্রথম ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতার দিকে যেতে পারে। আর ২০২৭ সালের জানুয়ারিতে প্রথম ইউনিট থেকে ১১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পূর্ণাঙ্গভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার আশা করা হচ্ছে। একই বছরের জুনে দ্বিতীয় ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শুরু এবং সেপ্টেম্বরে দুই ইউনিট মিলিয়ে ২২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
ঈশ্বরদীতে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুটি ভিভিইআর-১২০০ রিয়্যাক্টর স্থাপন করা হয়েছে। দুটি ইউনিট পুরোপুরি চালু হলে জাতীয় গ্রিডে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হবে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার প্রায় ১০ শতাংশ পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. শৌকত আকবর বলেন, জ্বালানি লোডিংয়ের পর রিঅ্যাক্টরের ভেতরে প্রথমবার নিয়ন্ত্রিত ও টেকসই ফিশন বিক্রিয়া শুরু করা হবে। “এটিই ফার্স্ট ক্রিটিক্যালিটি। শুরুতে খুব কম শক্তি স্তরে রিঅ্যাক্টর পরিচালনা করে সব প্যারামিটার পর্যবেক্ষণ করা হয়। এটি অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।”
নিউক্লিয়ার পাওয়ার কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক মানের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৫৯ জন বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ অপারেটিং লাইসেন্স পেয়েছেন। ধাপে ধাপে কেন্দ্র পরিচালনার দায়িত্ব দেশীয় বিশেষজ্ঞদের হাতে তুলে দেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রূপপুর শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প নয়, এটি দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তার কৌশলগত উদ্যোগ। এতে আমদানি করা ব্যয়বহুল তরল জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমবে। একই সঙ্গে কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ উৎপাদনও বাড়বে।
পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবস্থার আরেকটি বড় সুবিধা, একবার জ্বালানি লোড করা হলে প্রায় দেড় বছর তা দিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যাবে। চুক্তি অনুযায়ী প্রাথমিক তিন বছরের জ্বালানি সরবরাহ করবে রাশিয়া। পরে নির্ধারিত সময় পর পর জ্বালানি পরিবর্তন করা হবে।
রূপপুর প্রকল্প ঘিরে নিরাপত্তা প্রশ্নেও জোর দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মানদণ্ড মেনে প্রতিটি ধাপ সম্পন্ন করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। নিরাপত্তার কারণে সময় বেশি লাগলেও তা ইতিবাচক বলেই মনে করা হচ্ছে।
২০১১ সালে বাংলাদেশ ও রাশিয়ার আন্তরাষ্ট্রীয় চুক্তির ভিত্তিতে শুরু হওয়া এই প্রকল্প বহু প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে আজ নতুন পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছে। করোনা মহামারি, রাশিয়া ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ সংকটের মধ্যেও প্রকল্পের অগ্রগতি ধরে রাখা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, বিকেলের জ্বালানি লোডিং কেবল একটি আনুষ্ঠানিকতা নয়, বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত ইতিহাসে এটি এক প্রতীকী অগ্রযাত্রা। বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাস্তব পথে রূপপুরের এই পদক্ষেপ দেশের জ্বালানি খাতের ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করতে পারে।