নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম হলেও, এ খাতে পর্যাপ্ত অনুদান না পেয়ে ঋণের বোঝা ক্রমাগত বাড়িয়ে তুলছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভ কর্তৃক প্রকাশিত “ক্লাইমেট ডেট রিস্ক ইনডেক্স (CDRI)-২০২৫” প্রতিবেদনে উঠে এসেছে—বাংলাদেশ আজ এক গভীর জলবায়ু ঋণ ফাঁদে আটকে পড়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশের প্রতিজন নাগরিক এখন গড়ে ৭৯.৬ মার্কিন ডলার জলবায়ু সংশ্লিষ্ট ঋণের বোঝা বহন করছেন। যা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর গড় মাথাপিছু ঋণের প্রায় চারগুণ।
এছাড়া, দেশের ঋণ-অনুদান অনুপাত ২.৭, যেখানে স্বল্পোন্নত দেশের গড় মাত্র ০.৭। বহুপাক্ষিক উন্নয়ন ব্যাংক (MDB) থেকে আসা অর্থের মধ্যে ৯৪ শতাংশই ঋণ, অথচ বৈশ্বিক গড় মাত্র ১৯ শতাংশ।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জলবায়ু অভিযোজন ও প্রশমনে পর্যাপ্ত অনুদান না পেলে এই ঋণভিত্তিক অর্থায়ন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, জলবায়ু অর্থায়নের ৭০ শতাংশেরও বেশি ঋণ হিসেবে আসে, যা প্যারিস চুক্তির “দূষণকারী-পরিশোধকারী নীতি (Polluters Pay Principle)” এর সরাসরি লঙ্ঘন।
২০০০ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনজনিত দুর্যোগে ১৩ কোটিরও বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১,৩৬০ কোটি ডলার।
অথচ জলবায়ু অভিযোজন খাতে বাংলাদেশের বিনিয়োগ অনুপাত মাত্র ০.৪২, যেখানে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর গড় অনুপাত ০.৮৮। অর্থাৎ অভিযোজন খাতে অর্থায়নে বাংলাদেশ অর্ধেকেরও কম পাচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুসারে, প্রতিটি বাংলাদেশি পরিবার জলবায়ু বিপর্যয় থেকে বাঁচতে প্রতি বছর গড়ে ১০,৭০০ টাকা (প্রায় ৮৮ ডলার) খরচ করছে।
জাতীয় পর্যায়ে এই পরিমাণ দাঁড়ায় বছরে প্রায় ১৭০ কোটি ডলার।
তবে রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন যথাযথ না থাকায় এসব ব্যয় জনগণকে নিজ দায়িত্বে বহন করতে হচ্ছে।
সিডিআরআই রিপোর্টে উদ্বেগজনকভাবে বলা হয়েছে—বাংলাদেশের নামে রিপোর্টকৃত জলবায়ু অর্থায়নের ১৮.৮৪% জীবাশ্ম জ্বালানি প্রকল্পে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এই খাতগুলোর ঋণ-অনুদান অনুপাত ২৮.৮ : ১, যা প্রকৃত জলবায়ু অভিযোজন উদ্যোগে অর্থ বরাদ্দের স্বচ্ছতা ও যৌক্তিকতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
এছাড়া:
পানি সরবরাহ খাতে ঋণ অনুপাত: ৭.৭৮ : ১
পরিবহন ও গুদামজাতকরণে ঋণ অনুপাত: ১১২৩ : ১
জ্বালানি খাতে ঋণ অনুপাত: ১১.৯৯ : ১
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. ফারহিনা আহমেদ বলেন, “জীববৈচিত্র্য রক্ষা করলে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব কমে। তবে COP-এর মতো ফোরামে প্রতিশ্রুতি থাকলেও বাস্তব সহায়তা কম—ফলে সাধারণ মানুষ ঝুঁকিতে থাকছে।”
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়নে প্রকৃত সহায়তা পেতে জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা (NAP) ও এনডিসি বাস্তবায়নে গতি আনতে হবে।