খেলাধূলা ডেস্ক
ঐতিহাসিকভাবেই ফুটবল বিশ্বকাপে লাতিন আমেরিকার কোনো দল টুর্নামেন্টের শেষ দিকে পৌঁছালে পুরো মহাদেশের মানুষ তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়।
রোববারের (১৯ জুলাই) মেগা ফাইনালের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া দেদার ট্রল, মিম আর সমালোচনা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, এই নিয়মের একটি বড় ব্যতিক্রম রয়েছে—আর তা হলো ‘আর্জেন্টিনা’।
সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া একটি এডিটেড ছবিতে দেখা যায়, আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ স্পেনের তারকা লামিন ইয়ামাল ব্রাজিলের জার্সি পরে আছেন, যার ক্যাপশনে লেখা—‘ব্রাজিলিয়ানদের শেষ ভরসা।’ আর্জেন্টিনার প্রতি এই তীব্র বিদ্বেষ কেবল পেলে ও ম্যারাডোনার দেশের ঐতিহাসিক রেষারেষির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; মেক্সিকো এবং কলম্বিয়া, চিলিসহ পুরো লাতিন অঞ্চলের ফুটবলপ্রেমীরাই এখন মনে-প্রাণে প্রার্থনা করছেন যেন রোববার (১৯ জুলাই) লিওনেল মেসির দল স্পেনের কাছে হেরে যায়।
ফিফার ‘আশীর্বাদপুষ্ট’ আর্জেন্টিনা?
২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের আগেও একই ধরণের দৃশ্য দেখা গিয়েছিল। কলম্বিয়ান সমাজবিজ্ঞানী জার্মান গোমেজ এএফপি-কে জানান, আর্জেন্টিনার কারণে লাতিন আমেরিকার সেই ‘আঞ্চলিক সংহতির গতিশীলতা’ এখন ভেঙে গেছে।
তিনি মনে করেন, ডিজিটাল যুগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো এমন একটি ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি করেছে যে, আর্জেন্টিনা ফুটবল বিশ্বের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফা এবং এর সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনোর বড্ড প্রিয়পাত্র।
সাও পাওলোর একটি শপিং মলে বিশ্বকাপ স্টিকার বিনিময় করার সময় ৪২ বছর বয়সি ব্রাজিলিয়ান সমর্থক ফ্রান্সিসকো সান্তোস বলেন, ‘আর্জেন্টিনা সবসময় রেফারিদের কাছ থেকে বাড়তি সুবিধা পায়। ব্রাজিল যদি এবার হেক্সা (ষষ্ঠ শিরোপা) জিততে না-ই পারে, তবে আর্জেন্টিনা চারবার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার চেয়ে স্পেন দুবার চ্যাম্পিয়ন হোক, সেটাই আমি মনে-প্রাণে চাই।’
সমালোচকদের মতে, ফিফা বা বিশেষজ্ঞদের সমর্থন থাকার পরেও প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে পেনাল্টি, হলুদ বা লাল কার্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো সবসময় আর্জেন্টিনার পক্ষেই যায়। বোগোতার ফিন্যান্স কর্মী কামিলো আবুসাইদ সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, ‘আমরা সবাই ফাইনালে স্পেনকে সমর্থন করব।’
রাজনীতি ও বর্ণবাদের কালো ছায়া
খেলাধুলার সামাজিক দিক নিয়ে গবেষণা করা মেক্সিকান নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক হোর্হে নেগ্রো-র মতে, ‘এবারের বিশ্বকাপটি অত্যন্ত রাজনৈতিক রূপ নিয়েছে।’
দিয়েগো ম্যারাডোনাকে যেখানে ফিফার ক্ষমতার বিরুদ্ধে লড়াই করা একজন বিপ্লবী হিসেবে দেখা হতো, সেখানে বর্তমান বয়ানে মেসিকে দেখা হচ্ছে ফিফার ‘গোল্ডেন বয়’ হিসেবে।
মেক্সিকো সিটির একজন পুলিশ কর্মকর্তা আন্তোনিও লোপেজ বলেন, ‘মেসি একজন কিংবদন্তি। কিন্তু আপনি যদি মাঠে রক্ত পানি করে লড়ে চ্যাম্পিয়ন হন, আমি তা মেনে নেব। আর রেফারিরা যদি আপনাকে সাহায্য করে, তবে তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
এমনকি মেক্সিকোর প্রেসিডেন্ট ক্লাউদিয়া শেনবাউম এক সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের কাছে জানতে চেয়েছিলেন তারা ফাইনালে কাকে সমর্থন করছেন, তখন সমস্বরে উত্তর এসেছিল—‘স্পেন! স্পেন!’
এর বাইরে আর্জেন্টিনার অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং অতীতে ফরাসি দলের কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়দের উদ্দেশ্যে করা বর্ণবাদী মন্তব্য বা স্টেডিয়ামে ব্রাজিলিয়ানদের লক্ষ্য করে বানরের অঙ্গভঙ্গি করার মতো পুরোনো ইতিহাসও এই ক্ষোভকে আরও উস্কে দিয়েছে। এবারের বিশ্বকাপ চলাকালীনও যুক্তরাষ্ট্রের একজন কৃষ্ণাঙ্গ ইনফ্লুয়েন্সারকে (আইশোস্পিড) লক্ষ্য করে এক আর্জেন্টাইন সমর্থকের বর্ণবাদী আচরণের পর ফিফা আনুষ্ঠানিকভাবে এর তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
‘আমরা এমনই অসহ্য!’
আর্জেন্টিনাকে ঘিরে এই ভালোবাসা ও ঘৃণার তীব্র মিশ্রণ নিয়ে খোদ অধিনায়ক লিওনেল মেসিও সচেতন।
এক প্রতিক্রিয়ায় মেসি বলেন, ‘চার বছর আগে আমরা যা চেয়েছিলাম তা অর্জন করেছি: ফাইনালে খেলা এবং সেরা হওয়া। এবার আমরা আবারও প্রমাণ করেছি যে, কেউ আমাদের কোনো কিছু বিনামূল্যে উপহার দেয়নি। আমরা আবারও নিজেদের সেরা দুটির একটি হিসেবে প্রমাণ করেছি। এখন এতে যার কষ্ট হয়, হোক।’
আর্জেন্টিনায় অত্যন্ত জনপ্রিয় একটি অ্যালকোহল ব্র্যান্ড এই আর্জেন্টিনা-বিরোধী মনোভাবকে কাজে লাগিয়ে একটি রসাত্মক বিজ্ঞাপন তৈরি করেছে, যার মূল স্লোগান—‘আমরা এমনই অসহ্য।’ সেখানে দেখানো হয়, বিভিন্ন দেশের সমর্থকরা একসঙ্গে বসে আর্জেন্টিনার ফুটবল নিয়ে এই পাগলামি ও অহংকার নিয়ে অভিযোগ করছেন।
অবশ্য লাতিন আমেরিকার একটি বড় অংশ আর্জেন্টিনার বিপক্ষে থাকলেও, যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে দলটির অনুশীলনের সময় ‘মেসি! মেসি!’ চিৎকারে মুখরিত থাকছেন হাজারো ভক্ত।
আবার পেরুর ২০ বছর বয়সি শিক্ষার্থী ভালেন্তিনো তোকতোর মতো কিছু সমর্থক এখনো আঞ্চলিক সংহতি ধরে রেখেছেন, যিনি বলেন, ‘আমি আর্জেন্টিনাকেই সমর্থন করব, কারণ দিনশেষে এটি একটি দক্ষিণ আমেরিকান দেশ।’