অনলাইন ডেস্ক
কাঁচামালের সরবরাহ, মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণ এবং লো-ভ্যালু প্লাস্টিকের বাণিজ্যিক অযোগ্যতাকেই দেশের প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার শিল্পের সবচেয়ে বড় সংকট হিসেবে উল্লেখ করেছেন বাংলাদেশ পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের (বিপিসিএল) প্রধান নির্বাহী খাদেম মাহমুদ ইউসুফ।
তিনি বলেন, সবাই হাই-ভ্যালু প্লাস্টিক নিয়ে কাজ করতে চায়। কিন্তু লো-ভ্যালু প্লাস্টিক নিয়ে কাজ করতে চায় না। সমস্যার পাশাপাশি সম্ভাবনার কথাও ভাবতে হবে।
বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে বিশ্ব পরিবেশ দিবস উপলক্ষে ‘বাংলাদেশে টেকসই প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: চ্যালেঞ্জ ও অংশীদারদের দায়িত্ব’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এসব কথা বলেন।
পরিবেশ অধিদপ্তর ও প্রাণ-আরএফএল গ্রুপ যৌথভাবে এ বৈঠকের আয়োজন করে। গোলটেবিল বৈঠকে মিডিয়া পার্টনার ছিল জাগোনিউজ২৪.কম।
গোলটেবিল বৈঠকে খাদেম মাহমুদ ইউসুফ বলেন, দেশে পিইটি বোতলের ব্যাপক চাহিদা থাকলেও সরবরাহ তুলনামূলক কম। এর একটি বড় অংশ আবার রপ্তানি হয়। ফলে রিসাইক্লিং শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল সংগ্রহ করা কঠিন হয়ে পড়ছে ও এর দামও বেড়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, কোভিড-১৯ পরবর্তীসময়ে প্লাস্টিক বর্জ্য সংগ্রহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। আগে সংগ্রহকারীরা সরাসরি পুনর্ব্যবহারকারীদের কাছে বিক্রি করলেও এখন পুরো সংগ্রহ চেইন অনেকাংশে মধ্যস্বত্বভোগীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। ফলে প্রকৃত সংগ্রহকারীরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে পুনর্ব্যবহারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো দ্বিগুণ দামে কাঁচামাল কিনতে হচ্ছে।
খাদেম মাহমুদ ইউসুফ বলেন, মধ্যস্বত্বভোগীরা এখন বেশ সংগঠিত, অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী ও স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী। ফলে মূল্য নির্ধারণের পুরো প্রক্রিয়াটিই তাদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে।
তিনি জানান, বিশ্বব্যাংকের একটি প্রকল্পের আওতায় বিপিসিএল আটটি শহরে সংগ্রহ কেন্দ্র (কালেকশন হাব) স্থাপন করেছে। এর মাধ্যমে ছোট সংগ্রহ কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে সরাসরি সংযোগ তৈরি করা হয়েছে, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরতা কমানো যায়। এ প্রকল্পের আওতায় বর্জ্য সংগ্রহকারীদের জন্য স্বাস্থ্যসেবা, বিনামূল্যে চিকিৎসা ও ওষুধ, শিশু পরিচর্যা, প্রশিক্ষণ এবং আর্থিক সচেতনতা কর্মসূচিও চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি একটি ডিজিটাল ট্রেসেবিলিটি ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছে, যার মাধ্যমে কোন বর্জ্য কোথা থেকে সংগ্রহ হয়েছে, কীভাবে প্রক্রিয়াজাত হয়েছে ও শেষ পর্যন্ত কোন প্রতিষ্ঠানে গেছে- পুরো তথ্য অনুসরণ করা সম্ভব।
খাদেম মাহমুদ ইউসুফ বলেন, বর্তমানে পিইটিসহ উচ্চমূল্যের প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারে বাজার রয়েছে। তবে এলডিপিই, মাল্টিলেয়ার প্লাস্টিকসহ কম মূল্যমানের প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারে বড় ধরনের আর্থিক ঝুঁকি রয়েছে। এসব প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করলেও অনেক ক্ষেত্রে উৎপাদিত পণ্য বাজারজাত করা যায় না বা লোকসানের মুখে পড়তে হয়।
তিনি বলেন, এ সমস্যা সমাধানে এক্সটেন্ডেড প্রডিউসার রেসপনসিবিলিটি (ইপিআর) নীতিমালা চালু করা জরুরি।
ভারতের উদাহরণ তুলে ধরে বিপিসিএলের প্রধান নির্বাহী বলেন, সেখানে ইপিআরের মাধ্যমে কম মূল্যমানের প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারকে অর্থনৈতিকভাবে টেকসই করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন পুনর্ব্যবহারযোগ্য নয় এমন প্লাস্টিক আলাদাভাবে সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নিলে এ খাতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে।
করনীতি নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেন বিপিসিএলের প্রধান নির্বাহী। তিনি বলেন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এখনো বর্জ্যকে স্বতন্ত্র কাঁচামাল হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। এছাড়া পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ার বিভিন্ন ধাপে ভ্যাটের জটিলতা থাকায় প্রতিষ্ঠানগুলো ইনপুট ট্যাক্স সমন্বয়ের সুবিধা পাচ্ছে না।
তার মতে, এসব নীতিগত ও করসংক্রান্ত জটিলতা দূর করা না গেলে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার শিল্পের প্রায় পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা অনানুষ্ঠানিকই থেকে যাবে এবং এ খাতকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া কঠিন হবে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (বর্জ্য ও কেমিক্যাল ব্যবস্থাপনা) রাজিনারা বেগমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ড. মো. লুৎফর রহমান। পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক (আইন) খালেদ হাসান, পরিচালক (প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা) এ কে এম রফিকুল ইসলাম, পরিচালক (পরিকল্পনা শাখা) মো. হাসান হাসিবুর রহমান, পরিচালক (আইটি) মো. সাদিকুল ইসলাম, উপ-পরিচালক (বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ ব্যবস্থাপনা) ড. আব্দুল্লাহ আল মামুনসহ পরিবেশ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
এছাড়া ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা এয়ার কমোডর মো. মাহবুবুর রহমান তালুকদার, গাজীপুর সিটি করপোরেশনের প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা মো. সোহেল রানা, বাংলাদেশ পেট্রোকেমিক্যাল কোম্পানি লিমিটেডের (বিপিসিএল) প্রধান নির্বাহী খাদেম ইউসুফ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আসিব আহমেদ, বুয়েটের আরবান ও রিজিওনাল প্ল্যানিং বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শাকিল আক্তার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আব্দুল কাদের ইবনে কামাল, বিইউপির পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আরিফুর রহমান ভূঁইয়া, প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের পরিচালক (বিপণন) কামরুজ্জামান কামাল ও হেড অব সাসটেইনেবিলিটি সুমাইয়া তাবাসসুম আহমেদ, জাতিসংঘ শিল্প উন্নয়ন সংস্থা (ইউনিডো) বাংলাদেশের ন্যাশনাল প্রজেক্ট কো-অর্ডিনেটর সত্য ভট্টাচার্য, ইউনিলিভার বাংলাদেশের কান্ট্রি প্রকিউরমেন্ট লিড দিলরুবা আহমেদ চৌধুরী, ব্র্যাকের পরিচালক ড. মো. লিয়াকত আলী, লাফার্জ হোলসিমের ডেপুটি ম্যানেজার (জিওসাইকেল) তামরিন চৌধুরী, নেসলে বাংলাদেশের এইচআর ডিরেক্টর হোসনে আরা লোমা, ম্যারিকো বাংলাদেশের ডিরেক্টর (লিগ্যাল অ্যান্ড করপোরেট অ্যাফেয়ার্স) রাশেদ এহসান, ওয়েস্ট কনসার্নের কো ফাউন্ডার ও ডিরেক্টর ইফতেখার এনায়েতুল্লাহ, জাগো নিউজের সম্পাদক কে এম জিয়াউল হক, সমকালের সিনিয়র রিপোর্টার জাহিদুর রহমান প্রমুখ বৈঠকে অংশ নেন।