অনলাইন ডেস্ক
গ্লাসগোকে শুধু স্টেডিয়ামের ভেতর থেকে দেখা হয়, তাহলে অর্ধেকই দেখা হবে।
একদিকে ট্র্যাকে গতির যুদ্ধ, সুইমিং পুলে সেকেন্ডের লড়াই, ভেলোড্রোমে চাকার ঝড়। গ্যালারিতে উড়ছে ৭৪টি দেশের পতাকা। স্টেডিয়ামের গেট পেরিয়ে বাইরে এলেই দেখা যায় আরেকটি গ্লাসগো। যে শহর অপেক্ষা করে মানুষের গল্পের জন্য। এই শহর ইতিহাসকে বুকে ধরে হাঁটে, গানকে ভালোবাসে, আর নতুন মানুষকে আপন করে নিতে জানে।
সকালের আলোয় কেলভিনগ্রোভ পার্কে হাঁটলে মনে হয় গ্লাসগো একটু ধীর হয়ে যায়। শতবর্ষী গাছের ছায়ায় কেউ বই পড়ছেন, কেউ কুকুর নিয়ে হাঁটছেন, কেউ হাতে কফির কাপ নিয়ে দিনের শুরু করছেন। পাশেই দাঁড়িয়ে কেলভিনগ্রোভ আর্ট গ্যালারি অ্যান্ড মিউজিয়াম। শিল্প, ইতিহাস আর স্কটিশ ঐতিহ্য একসঙ্গে কথা বলে।
স্কটিশ নারী এমা ম্যাকলিওড কথা প্রসঙ্গে বলেন, ‘গ্লাসগো আমাদের পরিবারের মতো। বড় কোনো আয়োজন এলে আমরা সবাই তার অংশ হয়ে যাই।’
জর্জ স্কয়ারে এলে বোঝা যায়, গ্লাসগো ইতিহাসের শহর। পুরোনো স্থাপত্য, ভাস্কর্য আর ব্যস্ত মানুষের ভিড়ে এখানে অতীত আর বর্তমান পাশাপাশি হাঁটে। কমনওয়েলথের দিনগুলোতে এই চত্বরে দেখা যায় নানা দেশের মানুষের মিলন। কারও হাতে স্কটিশ পতাকা, কারও গায়ে অস্ট্রেলিয়ার জার্সি, আবার কারও কাঁধে লাল-সবুজের বাংলাদেশ।
বাংলাদেশি প্রবাসী জেরিন লিমা বলছিলেন, ‘গ্লাসগোতে থাকি অনেক বছর। নিজের দেশের পতাকা যখন রাস্তায় দেখি, মনে হয় বাংলাদেশ অনেক কাছে চলে এসেছে।’
রিভার ক্লাইডের তীরে সন্ধ্যা নামলে শহরটি পায় অন্য এক রূপ। একসময় বিশ্বের অন্যতম বড় জাহাজ নির্মাণ কেন্দ্রের প্রাণ ছিল এই নদী। আজ ক্লাইড গ্লাসগোর নতুন জীবনের প্রতীক। নদীর পাড় ধরে হাঁটছেন পর্যটক, সাইকেল চালাচ্ছেন তরুণরা, কেউ গান গাইছেন, কেউ তুলিতে আঁকছেন শহরের ছবি।
পাকিস্তানি বংশোদ্ভূত আবদুর রহমান, যিনি দীর্ঘদিন ধরে গ্লাসগোতে বসবাস করছেন, বললেন, ‘এই শহরের সবচেয়ে সুন্দর হলো মানুষ। এখানে আপনি কোথা থেকে এসেছেন, সেটি বড় নয়; আপনি মানুষ হিসেবে কেমন, সেটিই গুরুত্বপূর্ণ।’
বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী সাগর হাসতে হাসতে বলছিলেন, ‘খেলা চলাকালীন ব্যবসার চেয়ে গল্প বেশি হয়। সবাই নিজের দেশের কথা বলে, নিজের স্মৃতি ভাগাভাগি করে।’
এই শহরে স্কটিশ ব্যাগপাইপের সুরের সঙ্গে মিশে যায় ভারতীয় গান, বাংলাদেশি আড্ডা, পাকিস্তানি খাবারের গন্ধ। অভিবাসীদের হাত ধরে শহরটি আরও রঙিন হয়েছে। রাত নামার পরও গ্লাসগো ঘুমিয়ে পড়ে না। পাবগুলোতে আলো জ্বলে, লাইভ মিউজিক শুরু হয়। বিভিন্ন দেশের সমর্থকেরা পাশাপাশি বসে দিনের খেলা নিয়ে আলোচনা করেন। জয়-পরাজয়ের তর্ক থাকে, মানুষের মধ্যে দূরত্ব থাকে না।
তরুণ স্কটিশ স্বেচ্ছাসেবক লিয়াম ফ্রেজারের কথা, ‘কমনওয়েলথ শুধু খেলোয়াড়দের জন্য নয়। এটি আমাদের সবাইকে একসঙ্গে আনার সুযোগ।’