অনলাইন ডেস্ক
প্রতি পাঁচ বছর অন্তর সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদের হ্রাস-বৃদ্ধির বিবরণী নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সরকারের কাছে জমা দেওয়ার নিয়ম। তবে এমন নিয়ম থাকলেও তা মানা হয় না বললেই চলে। এ অবস্থায় প্রতি বছর সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদের হিসাব দাখিলের নিয়ম চালু করে অন্তর্বর্তী সরকার।
অন্তর্বর্তী সরকারের চালু করা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণী দাখিলের ব্যবস্থা বর্তমান সরকার অব্যাহত রাখবে কি না, তা নিয়ে প্রশাসনে আলোচনা চলছে। তবে সম্পদের হিসাব নেওয়ার কার্যক্রম বন্ধ হচ্ছে না। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদের হিসাব দাখিল বিদ্যমান আইন ও বিধি-বিধান অনুযায়ী চলবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অন্তর্বর্তী সরকারের নির্ধারিত প্রতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সম্পদের হিসাব জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা বহাল না রেখে সরকার আবারও ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’-এর বিধান অনুযায়ী পাঁচ বছর পরপর সম্পদ বিবরণী দাখিলের ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে। একই সঙ্গে সম্পদের হিসাব সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও যাচাই প্রক্রিয়া আরও সহজ ও স্বয়ংক্রিয় করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি শপথের মাধ্যমে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। এর আগে ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে দলটি। এর মধ্যদিয়ে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্বের সমাপ্তি ঘটে। ফলে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণী দাখিলে অন্তর্বর্তী সরকারের গৃহীত উদ্যোগের দায়িত্ব এখন এসে পড়েছে এই সরকারের ওপরে।
গণ-অভ্যুত্থানের পর দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকার দুর্নীতি প্রতিরোধ, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সব পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। এ লক্ষ্যে সম্পদ বিবরণী দাখিলের জন্য নতুন ছক প্রণয়ন করা হয় এবং নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়।
অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশনার আওতায় এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৫২৪ জন কর্মকর্তা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সম্পদের হিসাব জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারের ৫ হাজার ২৯১ জন, নন-ক্যাডারের ৩৫৫ জন এবং অন্যান্য ক্যাডারের ৬২১ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। তবে একই ব্যক্তি একাধিকবার তথ্য জমা দেওয়ায় মোট সংখ্যায় কিছু অমিল রয়েছে। বর্তমানে ডুপ্লিকেট তথ্য শনাক্ত ও যাচাইয়ের কাজ চলছে
২০২৪ সালের ১ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সব সরকারি কর্মচারীকে সম্পদের হিসাব জমা দিতে হবে। পরদিন সংবাদ সম্মেলনে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন সিনিয়র সচিব মো. মোখলেস উর রহমান জানান, দুদক সচিবকে সভাপতি করে ছয় সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, যারা সম্পদ বিবরণীর ফরমেট ও প্রয়োজনীয় সুপারিশ প্রণয়ন করবে।
সব সরকারি কর্মচারীকে সম্পদের হিসাব দেওয়ার নির্দেশ
কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে ২২ সেপ্টেম্বর নতুন ফরমেট প্রকাশ করা হয়। তখন ঘোষণা দেওয়া হয়, ২০২৫ সাল থেকে প্রতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে সব সরকারি চাকরিজীবীকে সম্পদের হিসাব জমা দিতে হবে। ২০২৪ সালের জন্য সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত। পরে কয়েক দফা সময় বাড়িয়ে ২০২৫ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত করা হয়।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশনার আওতায় এ পর্যন্ত ৬ হাজার ৫২৪ জন কর্মকর্তা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সম্পদের হিসাব জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে প্রশাসন ক্যাডারের ৫ হাজার ২৯১ জন, নন-ক্যাডারের ৩৫৫ জন এবং অন্যান্য ক্যাডারের ৬২১ জন কর্মকর্তা রয়েছেন। তবে একই ব্যক্তি একাধিকবার তথ্য জমা দেওয়ায় মোট সংখ্যায় কিছু অমিল রয়েছে। বর্তমানে ডুপ্লিকেট তথ্য শনাক্ত ও যাচাইয়ের কাজ চলছে।
কী ভাবছে সরকার?
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বর্তমান সরকার সম্পদের হিসাব নেওয়ার প্রক্রিয়া চালু রাখার পক্ষে। তবে অন্তর্বর্তী সরকারের চালু করা বার্ষিক হিসাব দাখিলের পরিবর্তে ‘সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯’ এর বিদ্যমান বিধান অনুসরণ করে পাঁচ বছর পরপর সম্পদ বিবরণী নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় রয়েছে।
একই সঙ্গে সম্পদের হিসাব দাখিলের ক্ষেত্রে যে বাস্তব জটিলতাগুলো সামনে এসেছে, সেগুলোও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। বিশেষ করে লাখ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাগজভিত্তিক সম্পদ বিবরণী সংরক্ষণ, যাচাই ও ব্যবস্থাপনা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে সম্পদ বিবরণী দাখিল প্রক্রিয়া অনলাইনে আনার বিষয়েও চিন্তাভাবনা চলছে। এতে তথ্য সংরক্ষণ, অনুসন্ধান ও যাচাই সহজ হবে এবং কাগজপত্র ব্যবস্থাপনার চাপ কমবে।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব দাখিলের বিষয়টি সরকারের বিদ্যমান বিধি-বিধান অনুযায়ী অব্যাহত থাকবে। এটি একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া।
তবে বর্তমান সরকার কীভাবে সম্পদের হিসাব নেবে সে বিষয়ে একটি নির্দেশনা জারি হবে বলেও জানিয়েছেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব দাখিলের বিষয়টি সরকারের বিদ্যমান বিধি-বিধান অনুযায়ী অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, ‘এটি একটি স্বাভাবিক প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। এ বিষয়ে যে বিধান ও নিয়ম রয়েছে, সেগুলো অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে।’
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারি চাকরিজীবীদের সম্পদ ও আয়-সংক্রান্ত বিষয়ে বিভিন্ন বিধান বিদ্যমান রয়েছে। আয়কর রিটার্ন দাখিলের পাশাপাশি সরকারি কর্মচারীদের আচরণ ও সম্পদ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কিত অন্যান্য বিধিও প্রতিপালন করতে হয়।’
তিনি বলেন, ‘সরকারি কর্মচারীদের ক্ষেত্রে সম্পদের হিসাব, জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে অনুমতি গ্রহণ, ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অংশ নিতে অনুমতি নেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। এসব বিধান যথাযথভাবে প্রতিপালন করা হবে।’
বর্তমান পদ্ধতিতে সম্পদের হিসাব নেওয়া অব্যাহত থাকবে কি না জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘যে বিধান কার্যকর রয়েছে, সেটিই অনুসরণ করা হবে। সরকারের বিধান থাকলে অবশ্যই হিসাব নেওয়া হবে।’