অনলাইন ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েলের ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানবিরোধী যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যের সরবরাহ রুট ব্যাহত হওয়ায় দেশের সিমেন্ট প্রস্তুতকারকরা বাড়তি চাপে পড়েছে। এর ফলে তারা প্রধান কাঁচামাল— বিশেষ করে ক্লিঙ্কার— এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে বেশি দামে আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছে।
এই সংঘাতের কারণে পরিবহন খরচও বেড়ে গেছে, যা আমদানির মোট ব্যয় আরও বাড়িয়েছে। অন্যদিকে, দেশে চাহিদা দুর্বল থাকায় উৎপাদকরা বাড়তি খরচ ভোক্তাদের ওপর চাপিয়ে দিতে পারছেন না। ফলে একদিকে বাড়তি উৎপাদন ব্যয়, অন্যদিকে দুর্বল বাজার—দুইয়ের চাপে পড়েছে শিল্পটি।
এ পরিস্থিতি খাতটির আমদানিনির্ভরতার বিষয়টিও সামনে নিয়ে এসেছে। ক্লিঙ্কার, চুনাপাথর, গ্র্যানুলেটেড স্ল্যাগ, ফ্লাই অ্যাশ ও জিপসামের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামালের বেশিরভাগই আমদানি করতে হয়। এর মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ ক্লিঙ্কারই বিদেশ থেকে আসে।
লাফার্জহোলসিম বাংলাদেশ পিএলসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ ইকবাল চৌধুরী বলেন, মধ্যপ্রাচ্য থেকে ক্লিঙ্কার আমদানি কমে যাওয়ায় বাংলাদেশের সিমেন্ট খাত নতুন করে ব্যয়চাপে পড়েছে। আগে উপসাগরীয় দেশগুলো থেকে প্রতিযোগিতামূলক দামে আমদানি করা যেত, কিন্তু এখন সেই সুবিধা নেই। বর্তমানে চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড থেকে বেশি দামে ক্লিঙ্কার আনতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলা এবং ইরানের হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার ফলে এই ভূরাজনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে। এর ফলে জাহাজ চলাচল কমে গেছে, পরিবহন ও বীমা খরচ বেড়েছে, লজিস্টিক ঝুঁকি ও যুদ্ধজনিত অতিরিক্ত খরচ (ওয়ার-রিস্ক প্রিমিয়াম) বৃদ্ধি পেয়েছে এবং জাহাজ চলাচলের রুট পরিবর্তন করতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সিমেন্ট শিল্পে এর প্রভাব তাৎক্ষণিক, কারণ এ খাত আমদানিকৃত ক্লিঙ্কার ও পাথরের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল।
তিনি জানান, সরবরাহ সংকট ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির কারণে ক্লিঙ্কারের দাম প্রতি টন ৪২–৪৩ ডলার থেকে বেড়ে প্রায় ৫৩ ডলারে পৌঁছেছে।
তিনি আরও বলেন, চাহিদা আগে থেকেই দুর্বল থাকায় কোম্পানিগুলো এই বাড়তি খরচ ভোক্তাদের ওপর চাপাতে পারছে না। এতে মুনাফার মার্জিন কমে যাচ্ছে এবং ব্যয় কমাতে বাধ্য হচ্ছে প্রতিষ্ঠানগুলো।
রয়্যাল সিমেন্ট লিমিটেডের জেনারেল ম্যানেজার মো. আবুল মনসুরও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, বিশ্বব্যাপী অস্থিরতার কারণে কাঁচামাল সংগ্রহ দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে। ক্লিঙ্কার আর মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসছে না, আর ওমান থেকে জিপসাম ও চুনাপাথর আনতে পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে গেছে।
তিনি আরও বলেন, ক্লিঙ্কারের দাম প্রতি টন প্রায় ৪৩ ডলার থেকে বেড়ে ৫৭–৫৮ ডলারে পৌঁছেছে। একইভাবে স্ল্যাগের দাম ১৬ ডলার থেকে বেড়ে ২৩–২৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা বৈশ্বিক শিপিংয়ে যুদ্ধজনিত প্রভাবের ফল।
মনসুর বলেন, তেলের দাম বৃদ্ধি, বীমা প্রিমিয়াম বাড়া এবং সমুদ্রপথে ঝুঁকি বেড়ে যাওয়ার কারণে পরিবহন খরচ কার্যত দ্বিগুণ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, এর প্রভাব ইতোমধ্যেই দেশীয় বাজারে পড়েছে। সিমেন্টের দাম প্রতি ব্যাগে ৩০ থেকে ৫০ টাকা বেড়েছে, যদিও প্রকৃত ব্যয় বেড়েছে ৭০ থেকে ৮০ টাকা পর্যন্ত। দুর্বল চাহিদার কারণে পুরোটা দাম বাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না।
তিনি বলেন, “ব্যয় বাড়ছে, কিন্তু বাজার সেই চাপ নিতে পারছে না।”
তিনি আরও জানান, স্থিতিশীলতার অপেক্ষায় অনেক ডেভেলপার প্রকল্প পিছিয়ে দিচ্ছেন, ফলে নির্মাণকাজ ধীর হয়ে গেছে এবং শিল্পে এর প্রভাব পড়ছে।
দেশের সামগ্রিক নির্মাণ খাতও চাপে রয়েছে। সরকারি ব্যয় কমে যাওয়া, বেসরকারি বিনিয়োগে স্থবিরতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং ব্যয় বৃদ্ধি—এসব কারণে রিয়েল এস্টেটসহ সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে প্রকল্প অনুমোদন, চাহিদা ও প্রবৃদ্ধি কমে গেছে।
বাংলাদেশ সিমেন্ট প্রস্তুতকারক সমিতির সভাপতি এবং প্রিমিয়ার সিমেন্ট মিলস পিএলসির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, গত পাঁচ বছরে খাতটি একাধিক ধাক্কার মুখে পড়েছে, যা ব্যবসা পরিচালনাকে কঠিন করে তুলেছে।
তিনি বলেন, অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসান গুনেও ভবিষ্যতে পরিস্থিতি উন্নতির আশায় কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, তবে এ অবস্থা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়।
তিনি বলেন, লাভজনক মার্জিন নিশ্চিত করা জরুরি, তবে অতিরিক্ত মূল্য বৃদ্ধি বাজারের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, “দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি হওয়ার সম্ভাবনা কম।”