চলচ্চিত্রের গল্প বলা শুরু হয় মানুষের চোখে দেখা বাস্তব থেকে। ক্যামেরা ছিল সেই চোখেরই বর্ধিত রূপ। আজ গল্প লেখা হচ্ছে অ্যালগরিদম দিয়ে, অভিনেতা বানানো হচ্ছে কোডে আর ক্যামেরা হয়ে গেছে কৃত্রিম বুদ্ধির একটি মস্তিষ্ক। মনে হচ্ছে, আমরা সত্যিই হাইপাররিয়েলিটির যুগে প্রবেশ করছি।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ফলে চলচ্চিত্রের গল্প এখন কেবল সৃষ্টির বিষয় নয়—হয়ে উঠছে ‘গণনা’র বিষয়; যা দর্শকের পছন্দ, প্রতিক্রিয়া ও ডেটা বিবেচনায় এনে সাজানো হচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন জাগে—যদি গল্প তৈরি হয় মেশিনের প্যাটার্ন ও প্রম্পটের ভিত্তিতে, তাহলে কখন তা আসল অনুভব হয়? কৃত্রিম বুদ্ধির তৈরি কাহিনি যত নিখুঁত কাঠামোয় হোক, তাতে কি থাকে মানবিক জীবনের গভীরতা, অভিজ্ঞতার স্পন্দন?
গল্প বলার ইতিহাস মূলত মানুষেরই ইতিহাস। আগুনের চারপাশে বসে প্রথম মানুষের গল্প বলার উপাদান ছিল তার দিনযাপন ও সামাজিক বন্ধন। ধীরে ধীরে যোগ হতে থাকে রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক পরিচয়। কিন্তু একুশ শতকের সেই গল্প লেখা হচ্ছে অ্যালগরিদম দিয়ে, বিশ্লেষিত হচ্ছে মেশিনে, আর কাহিনির মূল চালক হয়ে উঠছে ডেটা।
২০১৬ সালে গুগলের টেনসর ফ্লো ব্যবহার করে ফ্রেন্ডস সিরিজের নতুন পর্ব তৈরি হয়েছিল। আজ নেটফ্লিক্স বা ডিজনির মতো স্টুডিওগুলো ইতিমধ্যেই কাহিনি ও দর্শক ডেটা বিশ্লেষণে কৃত্রিম বুদ্ধি ব্যবহার করছে। ২০১৬ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত মরগান চলচ্চিত্রে কৃত্রিম বুদ্ধির উল্লেখযোগ্য ব্যবহার ছিল। একটি স্টুডিও ও একটি গবেষণা সংস্থা একসঙ্গে কাজ করে ওয়াটসন নামের একটি সিস্টেমকে ব্যবহার করেছিল ট্রেলার তৈরিতে। সেটিকে ১০০টির বেশি ভৌতিক ও থ্রিলার ট্রেলার বিশ্লেষণ করতে দেওয়া হয়, তারপর চলচ্চিত্রের মূল দৃশ্য থেকে ১০টি নির্বাচন করে ট্রেলার তৈরি করা হয়।
আজ গল্প কেবল বলা হয় না—দর্শক সেই গল্পে প্রবেশ করেন। ভার্চ্যুয়াল রিয়েলিটি বা ইন্টারঅ্যাকটিভ প্ল্যাটফর্মে তারা চরিত্রের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সংযুক্ত, পথ ও মোড় নির্ধারণ করতে পারে। নেটফ্লিক্সের ব্যান্ডারসন্যাচ বা দ্য ওয়াকিং ডেড: সেন্টস অ্যান্ড সিনার্স ভিআর তাঁর উৎকৃষ্ট উদাহরণ। এখানে অ্যালগরিদম গল্পকে দর্শকের প্রতিক্রিয়া অনুযায়ী রূপান্তরিত করছে, ফলে প্রতিটি অভিজ্ঞতা হয় আলাদা। ইমার্সিভ ও ইন্টারেকটিভ এই অভিজ্ঞতা দর্শককে কেবল পর্দার সামনে না রেখে, গল্পের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করে। ফলে গল্প এখন জীবন্ত হয়ে উঠেছে, প্রত্যেক দর্শকের চোখে আলাদা আলাদা কাহিনি হিসেবে, আলাদা দৃষ্টিকোণ থেকে।
ওয়াল্টার বেঞ্জামিন তাঁর ‘দ্য ওয়ার্ক অব আর্ট ইন দ্য এজ অব মেকানিক্যাল রিপ্রোডাকশন’ প্রবন্ধে ‘অরা’ বা শিল্পের আত্মা হারানোর আশঙ্কার কথা বলেছিলেন। এখন সেই ‘অরা’ নতুনভাবে প্রশ্নবিদ্ধ—একজন লেখক কি এখনো চলচ্চিত্রের কেন্দ্রে আছেন, নাকি সেটি মেশিনের হাতে চলে যাচ্ছে?
আমেরিকান সমাজবিজ্ঞানী শোশানা জুবফ্ফ তাঁর দ্য এজ অব সারভেইল্যান্স ক্যাপিটালিজম বইটিতে দেখিয়েছেন, ডেটা আজ পুঁজির নতুন জ্বালানি। চলচ্চিত্রও এখন ডেটা-নির্ভর শিল্পে পরিণত হচ্ছে। দর্শকের অনুভবকে মাপা হচ্ছে অ্যালগরিদমিক ক্যালকুলেশনে, গল্প তৈরি হচ্ছে বাজারমুখী প্যাটার্নে। চলচ্চিত্র ও টেলিভিশনের প্রযোজনা সংস্থাগুলো এখন দর্শকের আচরণ বিশ্লেষণ করে নির্ধারণ করছে কোন ধরনের গল্প কোন ফর্মে বলা হবে। এই গণনা-চালিত পথ গল্পকথনকে যেমন সীমাবদ্ধ করছে, তেমনি দিচ্ছে এক নতুন পথ।
অভিনয় একসময় ছিল মাংস–রক্তের একান্ত মানবিক শিল্প—চোখের ভাষা, মুখের অভিব্যক্তি আর শরীরের অঙ্গভঙ্গিতেই গড়ে উঠত পর্দার চরিত্র। কিন্তু আজ সেই মুখ আর আসল না–ও হতে পারে। প্রযুক্তির ডিপফেক ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন এমনভাবে অভিনেতার মুখ, কণ্ঠ ও শরীর নকল করতে পারে যে দর্শক পার্থক্যই বুঝতে পারেন না। বড় বড় স্টুডিও এখন অভিনেতাদের থ্রি–ডি ফেস স্ক্যান নিয়ে ডেটাবেজে সংরক্ষণ করছে। ভবিষ্যতে এই মুখ ব্যবহার করে চলচ্চিত্র বানানো সম্ভব—অভিনেতার শারীরিক উপস্থিতি ছাড়াই। এটিই ‘ফেস প্যাটার্ন’ বা চেহারার মালিকানা নিয়ে নতুন বিতর্কের কেন্দ্র।
প্রস্তুতির ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র বিবেচনা করা প্রয়োজন। প্রথমত, ডিপফেক ও ফেস ডেটার ব্যবহার নিয়ে স্পষ্ট আইনি নীতি থাকা আবশ্যক। কোন পরিস্থিতিতে কাকে কীভাবে ব্যবহার করা যাবে, সেটি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, অভিনেতা, সংবাদ পাঠক ও কনটেন্ট ক্রিয়েটরের চেহারা, কণ্ঠ ও ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের ওপর তাঁদের নিজস্ব অধিকার সুরক্ষিত রাখতে হবে। তৃতীয়ত, যেকোনো কনটেন্টে কৃত্রিম বুদ্ধি ব্যবহারের বিষয়টি স্বচ্ছভাবে ঘোষণা করা উচিত, যাতে দর্শক বা শ্রোতা জানেন কোন অংশটি বাস্তব এবং কোন অংশটি কৃত্রিম। শেষে, স্থানীয় শিল্পী ও সংবাদকর্মীদের সংহত করতে ইউনিয়ন ও শ্রমিক সংগঠনগুলোকে আধুনিক নীতিমালা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিসম্পর্কিত চুক্তি তৈরি করতে হবে।
এই প্রস্তুতি না নিলে প্রযুক্তির অগ্রগতি শিল্পীর সৃজনশীলতা ও মানবিকতার জায়গা সংকুচিত করে দিতে পারে। সঠিক নীতি ও সচেতন ব্যবহার নিশ্চিত করলে বাংলাদেশি চলচ্চিত্র ও মিডিয়া চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের একটা অবস্থান তৈরি করতে পারবে।