অনলাইন ডেস্ক
চেক ডিজঅনার বা বাউন্সের ঘটনায় দায়ের করা মামলার মূল উদ্দেশ্য হলো পাওনাদারের অর্থ আদায় নিশ্চিত করা, আসামিকে কারাগারে পাঠানো নয়-এমন গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে রায় দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালত বলেছেন, নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস (এনআই) অ্যাক্টের আওতায় করা মামলায় কারাদণ্ড ব্যতিক্রমধর্মী পরিস্থিতিতেই দেওয়া উচিত।
সম্প্রতি প্রকাশিত এক রায়ে বিচারপতি ড. মো. বশির উল্লাহর একক হাইকোর্ট বেঞ্চ এই মন্তব্য করেন। গত ২২ জুলাই রায়টি দেওয়া হলেও এর লিখিত অনুলিপি আজ বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা হয়েছে।
রায়ে আদালত আসামির বিরুদ্ধে আরোপিত অর্থদণ্ড বহাল রাখলেও ছয় মাসের কারাদণ্ড বাতিল করে দেন। একই সঙ্গে বকেয়া অর্থ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পরিশোধের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
রায়ে হাইকোর্ট উল্লেখ করেন, এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার মামলার উদ্দেশ্য শাস্তি প্রদান নয়; বরং চেকের মাধ্যমে প্রতিশ্রুত অর্থ আদায় নিশ্চিত করা। তাই কারাদণ্ডকে সাধারণ শাস্তি হিসেবে বিবেচনা না করে কেবল বিশেষ ও যৌক্তিক পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করা উচিত।
আদালত এ বিষয়ে পূর্বের ‘আমান উল্লাহ বনাম রাষ্ট্র’ মামলার রায়ের দৃষ্টান্তও উল্লেখ করেন। সেখানে বলা হয়েছিল, চেক ডিজঅনার মামলায় কারাদণ্ড একটি কঠোর শাস্তি এবং এর মাধ্যমে শাস্তিমূলক উদ্দেশ্য তেমনভাবে পূরণ হয় না। বর্তমান মামলায়ও হাইকোর্ট সেই নীতির সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন।
মামলার নথি অনুযায়ী, বরিশালের এক গবাদিপশু ব্যবসায়ীর চেক ডিজঅনার সংক্রান্ত ফৌজদারি রিভিশন আবেদনের চূড়ান্ত শুনানি শেষে বিচারপতি ড. মো. বশির উল্লাহর একক হাইকোর্ট বেঞ্চ গত ২২ জুলাই এই রায় দেন। রায়ের লিখিত অনুলিপি বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) প্রকাশ করা হয়েছে।
রায়ে অর্থদণ্ড বহাল রেখে আসামির কারাদণ্ড বাতিল করে দিয়েছেন হাইকোর্ট। আদালতে আসামি পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. সাইফুল আলম। ঋণ প্রদানকারীর পক্ষে ছিলেন আইনজীবী দেব দুলাল বড়াল। রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মো. সফিকুল ইসলাম, সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল ফারহানা আবেদীন, হেমায়েত উদ্দিন এবং কে এম সাইফুল ইসলাম।
রায়ে আদালত ‘আমান উল্লাহ বনাম রাষ্ট্র’ মামলার নজির উল্লেখ করে বলেন, এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারার বিচারে কারাদণ্ড প্রদান করা একটি অতি কঠোর সাজা, যা থেকে কোনো শাস্তিমূলক উদ্দেশ্য সাধিত হয় না। উক্ত নীতি ও পর্যবেক্ষণের সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ একমত পোষণ করছি।
মামলার প্রেক্ষাপট
গবাদিপশুর ব্যবসার উদ্দেশ্যে আসামি মো. আলাউদ্দিন বাদীর (যিনি বরিশালের তৃতীয় যুগ্ম দায়রা আদালতের বাদী ছিলেন) কাছ থেকে ৫ লাখ টাকা ঋণ নেন। উক্ত ঋণ পরিশোধের নিমিত্তে আলাউদ্দিন রূপালী ব্যাংক লিমিটেড, বরিশাল বাজার রোড শাখার একটি চেক প্রদান করেন। ২০২০ সালের ২ নভেম্বর চেকটি ব্যাংকে জমা দিলে পর্যাপ্ত তহবিল না থাকার কারণে তা (চেক) নাকচ (ডিজঅনার) হয়। পরবর্তী সময়ে আইনি নোটিশ প্রদান ও নির্দিষ্ট মেয়াদে টাকা পরিশোধে ব্যর্থ হওয়ায় বাদী ২০২০ সালের ২০ ডিসেম্বর বরিশালের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট (আমলি আদালত) আদালতে এনআই অ্যাক্টের আইনে (সি.আর.) মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে তা বরিশাল দায়রা জজ আদালতে পাঠান। দায়রা জজ মামলাটি বরিশাল তৃতীয় যুগ্ম দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর করেন। ওই আদালত ২০২১ সালের ১৪ অক্টোবর এআই অ্যাক্টর ১৩৮ ধারায় আসামি আলা উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন।
এরপর ২০২২ সালের ১৮ জানুয়ারি বরিশালের তৃতীয় যুগ্ম দায়রা জজ আদালত আসামি মো. আলাউদ্দিনকে এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে ছয় মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড এবং চেকের সমপরিমাণ ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করেন। পরে অর্থদণ্ডের অর্ধেক (২ লাখ ৫০ হাজার) টাকা জমা দিয়ে বরিশাল দায়রা জজ আদালতে আপিল করেন আসামি আলাউদ্দিন। পরে আপিল আদালত (বরিশাল দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল ও বিশেষ দায়রা জজ) ২০২২ সালের ১৪ ডিসেম্বর কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড বহাল রেখে আসামির আপিল খারিজ করে দেন।
বিচারিক আদালতের ওই রায়ের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ হয়ে আসামি আলাউদ্দিন হাইকোর্টে রিভিশন আবেদন করেন। গত ২২ জুলাই হাইকোর্ট বিচারিক আদালতের রায় বাতিলে জারি করা রুল খারিজ করে অর্থদণ্ড বহাল রাখেন। পাশাপাশি বিচারিক আদালতের রায়ের সাজার অংশটি ন্যায় বিচারের স্বার্থে সংশোধন করে তা (কারাদণ্ড) বাতিল করে দেন। অর্থাৎ আসামির অর্থদণ্ড বহাল রেখে কারাদণ্ড বাতিল করে দেন আদালত।
রায়ের কপি প্রাপ্তির তিনি মাসের মধ্যে আসামিকে (আলাউদ্দিন) ডিজঅনার চেকের অবশিষ্ট অংশ অর্থাৎ ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধের নির্দেশ দেন আদালত। অনাদায়ে আসামিকে দুই মাসের কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে। তবে কারাদণ্ড ভোগ করলেও তিনি জরিমানা পরিশোধের দায় থেকে অব্যাহতি পাবেন না এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৮৬ ধারা অনুযায়ী আদালত উক্ত টাকা আদায় করা হবে বলে রায়ে উল্লেখ করেছেন আদালত।