অনলাইন ডেস্ক
সরকারি জুটমিলগুলোর বিপুল পরিমাণ জমি ব্যবহারের সঠিক উদ্যোক্তা পাচ্ছে না সরকার। লোকসানের কারণে বিগত ২০২০ সালে বন্ধ করে দেয়া হয় বিজিএমসির ২৬টি জুট মিল। বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ওই জুট মিলগুলোকে তৎকালীন সরকার বেসরকারি খাতে দীর্ঘমেয়াদে লিজের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। আর গত চার বছরে সেগুলোর মধ্যে ১৪টি মিল বেসরকারি খাতে লিজ দেয়া গেছে। আর লিজের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সেখানে শিল্প-কারখানা বসানো কথা থাকলেও বাস্তবে তা হয়নি। ফলে শর্ত অনুযায়ী কর্মসংস্থানও করেনি। মাত্র ৬টি মিলে এখন পর্যন্ত কারখানা চালু হয়েছে। এমন পরিস্থিতি সরকার লিজ দেয়া ১৪টি মিলের মধ্যে ৪টি মিল লিজ বাতিলের চিন্তা করছে। ওই জুট মিল হচ্ছে হাফিজ জুট মিলস, গালফা হাবিব লিমিটেড, গুল আহমদ জুট মিলস এবং আর আর জুট মিলস। চার জুট মিল মূলত শিল্পপ্রতিষ্ঠান করে বেশি বেশি কর্মসংস্থান করতেই লিজ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু লিজগ্রহীতারা এখন জুট মিলের জায়গায় কইটেইনার টার্মিনাল করতে আগ্রহী। বাংলাদেশ জু টমিলস কর্পোরেশন (বিজেএমসি) সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সরকারি জুট মিলগুলোর শত শত একর জমি পড়ে রয়েছে। সরকার চাচ্ছে বন্ধ হওয়া জুট মিলগুলোতে শ্রমঘন শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করে দেশের কর্মসংস্থান বাড়াতে। সেজন্যই প্রথমবারের মতো সরকার চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের আওতাধীন আমিন জুট মিলের ৩৩ দশমিক ৬৪ একর জমি লিজ দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওই ব্যাপারে পাট মন্ত্রণালয় প্রধানমন্ত্রীর অনুমতি চেয়েছে। যদিও অনেক উদ্যোক্তা সরকারের শর্ত মেনে সরকারি জুট মিল লিজ নিয়েছে। কিন্তু শর্ত অনুযায়ী তারা শিল্পপ্রতিষ্ঠান সেখানে বসাতে পারেনি। ফলে ওই ব্যাপারে এখন সিদ্ধান্ত নেবে সরকার। বিজেএমসির বন্ধ হওয়া ২৬টি জুট মিলের মধ্যে জুটো ফাইবার গ্লাস ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড ঢাকাই মসলিন হাউজ বসাতে বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের কাছে হস্তান্তর করা হয়। আর আইনগত জটিলতা ও সিটি করপোরেশনের আওতাভুক্ত হওয়ায় বাকি ২৫টির মধ্যে চারটি মিল বেসরকারি খাতে লিজ না দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে বাগদাদ-ঢাকা কার্পেট ফ্যাক্টরি, আলীম জুট মিলস, করিম জুট মিলস ও লতিফ জুট মিলস।
সূত্র জানায়, লিজ দেয়া সরকারি জুট মিলগুলোর মধ্যে নরসিংদীর বাংলাদেশ জুট মিলস মোটামুটি ভালো রয়েছে। ওই মিলের ৭৭ একর জমির মধ্যে টিকে গ্রুপের জুট অ্যালায়েন্স লিমিটেড ৩৪ দশমিক ৩৫ একর এবং প্রাণ গ্রুপের প্রাণ ফুড লিমিটেড ৩ দশমিক ২৯৬ একর জমিতে কারখানা করেছে। দুটি কারখানাই চালু আছে। জুট অ্যালায়েন্স প্রতি বর্গফুট ৫ দশমিক ০৫৯ টাকা এবং প্রাণ ফুড ২ দশমিক ৫০ টাকা ভাড়ায় ওই জমি লিজ নিয়েছে। আর যশোরের রাজঘাটে জুট ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ৮১ একর জমির মধ্যে ২৭ দশমিক ৪০ একর জমি আকিজ জুট মিলস লিমিটেড ৩০ বছরের জন্য লিজ নিয়েছে। তারা প্রতি বর্গফুট ভাড়া দিচ্ছে ২ দশমিক ৫২ টাকা। আকিজের ওই কারখানাও চালু আছে। তাছাড়া খুলনার দৌলতপুর জুট মিলসের ২২ একরের মধ্যে ইউনিওয়ার্ল্ড ফুটওয়্যার টেকনোলজি লিমিটেড ১৩ দশমিক ৮০ একর জমি ভাড়া নিয়ে কারখানা করেছিল। আর ২০২৩ সালে তারা ৩০ বছরের জন্য লিজ নিয়ে ফ্যাক্টরিও চালু করেছিল। কিন্তু গত ঈদুল ফিতরের পর তা বন্ধ রয়েছে। যশোরের কার্পেটিং জুট মিলস রিগাল জুট লিমিটেডকে ২০২৪ সালে ৩০ বছরের জন্য লিজ দেয়া হয়। সেটির প্রতি বর্গফুট ভাড়া ১ দশমিক ৭০ টাকা। সেটিও পুরোদমে চালু আছে। চট্টগ্রামের মিলস ফারনিশিংস লিমিটেড ২০২৩ সালে ফোর এমারেল্ড এক্সেসরিজ নামে একটি প্রতিষ্ঠানকে লিজ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু রপ্তানি নির্ভর ওই শিল্প কারখানার বন্ড লাইসেন্স সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সেটি এখনো চালু হয়নি। চট্টগ্রামের গালফ্রা হাবিব জুট মিল ২০২৩ সালে শফি মোটরস নামে একটি প্রতিষ্ঠান প্রতি বর্গফুট ১ দশমিক ৫৫ টাকায় এটি লিজ নিয়েছিল। সেখানে কিছু কারখানা চালুও করা হয়েছে। এখন তারা ওই জায়গায় ব্যবসার ধরন বদলাতে চায় সরকারকে জানিয়েছে। সেখানে কনটেইনার টার্মিনাল গড়ে তুলতে চাওয়া হচ্ছে। একই ভাবে চট্টগ্রামের কেডিএস গ্রুপ ২০২৩ সালে গুল আহমেদ জুট মিল লিজ নিয়েছিল। ওই জুট মিলে পানির স্তর অনেক নিচে হওয়ায় লিজগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান সরকারকে সেখানে কনটেইনার টার্মিনাল করার আগ্রহ দেখিয়েছে। তাছাড়া ২০২৩ সালে নরসিংদীর ইউএমসি জুট মিল লিজ নেয় বি সুয়েটারস নামে এক প্রতিষ্ঠান। সেটি এখন চালু আছে। খুলনার খালিসপুর জুট মিল ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসে লিজ নেয় রেডিয়েন্ট ফার্মাসিটিক্যালস লিমিটেড। ওই জুট মিলের একটি ইউনিটে কিছু উৎপাদন করা হলেও বাকি দুটি ইউনিট এখনো চালু হয়নি। খুলনার ইস্টার্ন জুট মিলস ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে আটলান্টিক জুট লিমিটেডকে বরাদ্দ দেয়া হয়। সেটি এখন চালু আছে। চট্টগ্রামের আর আর জুট মিল প্রাণ গ্রুপের হাবিগঞ্জ অ্যাগ্রোকে লিজ নিয়েছিল। লিজগ্রহীতা প্রতিষ্ঠান এখন সেখানে ফার্নিচার ফ্যাক্টরির পর কনটেইনার টার্মিনাল করতে আগ্রহ। কিন্তু এই ব্যাপারে সরকার নেতিবাচক অবস্থানে রয়েছে। চট্টগ্রামের হাফিজ জুট মিলসকে ২০২৫ সালে চট্টগ্রাম ডেনিমকে লিজ দেয়া হয়। সেটিতে এখনো পুরোনো যন্ত্রপাতি পড়ে রয়েছে। সেখানো এখনো কোনো কারখানা চালু হয়নি। রাজশাহী জুট মিলস প্রাণ আরএফএলের বঙ্গ বিল্ডিং ম্যাটেরিয়ালস লিমিটেডকে দেয়া হয়। অবশ্য সেটির ফুডওয়্যার এবং এক্সেসরিস উৎপাদন কার্যক্রম চলছে। খুলনার ক্রিসেন্ট জুট মিলস ২০২৫ সালে বিশ্বাস পোলট্রি এবং ফিশারিজ কোম্পানিকে। কিন্তু সেটির এখনো দখল হস্তান্তর হয়নি। তাছাড়া বাকি প্লাটিনাম জুবেলি জুট মিলস, জাতীয় জুট মিলস এবং স্টার জুট মিলস লিজ নিতে কয়েকটি বেসরকারি কোম্পানি আগ্রহ দেখিয়েছে। তাদের দরপত্রের মূল্যায়ন চলছে। তবেএখনো বরাদ্দ দেয়া হয়নি।
সূত্র আরো জানায়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে ফিরিয়ে আনা কো-অপারেটিভ জুট মিলস দ্বিতীয় দফা লিজ দিতে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। সেখানে কয়েকটি বেসরকারি কোম্পানি অংশ নিলেও এখনো চূড়ান— সিদ্ধান্ত হয়নি। চট্টগ্রামের কেএফডি লিমিটেড বরাদ্দ দিতে দরপত্র দেয়া হয়েছে। সেখানে তিনটি বেরসকারি কোম্পানি অংশ নিয়েছে। কিন্তু এখনো চূড়ান্ত বরাদ্দ দেয়ার সিদ্ধান্ত হয়নি। তাছাড়া চট্টগ্রামের এম এম জুট মিলস একাধিকবার দরপত্র দিয়েও লিজ দেয়ার চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। সেটি এখন বিজেএমসি বিকল্পভাবে কাজে লাগানোর চেষ্টা করছে। তাছাড়া বাগদাদ-ঢাকা কার্পেট জুট মিলসের জমির ব্যাপারে চট্টগ্রামের এ কে খান জুট মিলের মালিকানা নিয়ে মামলা আছে। ওই কারণে দীর্ঘদিন ধরে সরকার সেটি লিজ দিতে পারছে না।