অনলাইন ডেস্ক
আজ ২৯ জুলাই, বিশ্বজুড়ে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হচ্ছে ‘আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস’। বাঘের প্রাকৃতিক আবাসস্থল রক্ষা এবং বাঘ সংরক্ষণে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে প্রতি বছর দিবসটি পালিত হয়।
দিবসটি উপলক্ষে আজ (বুধবার, ২৯ জুলাই) ঢাকায় কেন্দ্রীয়ভাবে এবং সুন্দরবনের চারটি রেঞ্জে স্থানীয়দের অংশগ্রহণে আলোচনা সভা, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতাসহ বিভিন্ন সচেতনতামূলক কর্মসূচির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে ‘আন্তর্জাতিক বাঘ দিবস’ পালিত হচ্ছে।
কেমন আছে সুন্দরবনের বাঘ
দেশে রয়েল বেঙ্গল টাইগারের প্রধান আবাসস্থল সুন্দরবনে একসময় চার শতাধিক বাঘ ছিল। সর্বশেষ ২০২৪ সালের বাঘ জরিপ অনুযায়ী, সুন্দরবনে বর্তমানে বাঘের সংখ্যা ১২৫টি। এর আগে ২০১৫ সালের বাঘশুমারিতে সুন্দরবনে বাঘের সংখ্যা ছিল ১০৬টি। ২০১৮ সালে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১১৪টিতে। অর্থাৎ আগের জরিপের তুলনায় ২০২৪ সালের শুমারিতে বাঘের সংখ্যা বেড়েছে ১১টি। জরিপে ২১টি বাঘশাবকের ছবিও পাওয়া গেছে।
সুন্দরবনের অভ্যন্তরে পাঁচটি বিশাল নদীর কারণে পূর্ব-পশ্চিমে বাঘের চলাচল সীমিত হয়ে গেছে। পাশাপাশি চোরাশিকারিদের দৌরাত্ম্য, খাদ্যসংকট এবং জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ায় বাঘের স্বাভাবিক চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে। এসব কারণে বাঘের দেহে জিনগত ও কাঠামোগত পরিবর্তন তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে ধীরে ধীরে কমছে তাদের রোগ প্রতিরোধ ও পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা।
গত দুই দশকে সুন্দরবনে বাঘের টিকে থাকার লড়াই আরও কঠিন হয়েছে। চোরাশিকারিদের দৌরাত্ম্য এবং হরিণ শিকারের কারণে বাঘের খাদ্যসংকট তৈরি হচ্ছে। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে আসায় বাঘের অস্তিত্বও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।
সুন্দরবনে বাঘ সুরক্ষায় পদক্ষেপ
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলোচ্ছ্বাসের সময় বাঘসহ বন্যপ্রাণীদের আশ্রয়ের জন্য ২০টি স্থানে মাটির উঁচু টিলাসহ (কেল্লা) আশ্রয়স্থল তৈরি করা হয়েছে। বন্যপ্রাণীদের সুপেয় পানির জন্য খনন করা হয়েছে পুকুর।
বাঘ যাতে লোকালয়ে ঢুকতে না পারে, সে জন্য ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে। বন্যপ্রাণী শিকারের সম্ভাবনা রয়েছে—এমন ২৫টি হটস্পট চিহ্নিত করে ক্যামেরা ট্র্যাপের মাধ্যমে মনিটরিং করা হচ্ছে।
বাঘের প্রজনন মৌসুমে জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই তিন মাস সুন্দরবনে পর্যটক এবং জেলে-বাওয়ালিদের প্রবেশ বন্ধ রাখা হচ্ছে।
বাঘ রক্ষায় আইন
স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ) আদেশ জারির মাধ্যমে সুন্দরবনে বাঘ শিকার আইনগতভাবে নিষিদ্ধ করা হয়। পরবর্তীতে ২০১২ সালে বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন সংশোধন করে বাঘ শিকার, হত্যা, পাচার ও অবৈধ ব্যবসার বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তির বিধান করা হয়। এর ফলে বন বিভাগ আইনি ভিত্তিতে আরও কার্যকরভাবে বাঘ সংরক্ষণ কার্যক্রম পরিচালনা করতে শুরু করে।
থেমে নেই বাঘের মৃত্যু
আইন কঠোর হলেও বহু বছর ধরে মানুষ ও বাঘের দ্বন্দ্ব, খাদ্যের সন্ধান এবং প্রাকৃতিক নানা কারণে বাঘ মারা পড়েছে। গত ২৪ বছরে সুন্দরবনে ৩০টিসহ মোট ৯১টি বাঘের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে পাচারকারী ও চোরাশিকারিদের হাতে নিহত হয়েছে ২৬টি। লোকালয়ে ঢুকে পড়ায় গ্রামবাসীর পিটুনিতে মারা গেছে ১৪টি। বনদস্যুদের হাতে প্রাণ গেছে ১৮টির। বার্ধক্যজনিত কারণে মারা গেছে ২১টি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে মারা গেছে তিনটি বাঘ।
এ ছাড়া বাঘের চামড়া উদ্ধারের মধ্য দিয়ে আরও অনেক বাঘ হত্যা ও পাচারের শিকার হয়েছে বলে ধারণা করা হলেও এসব ঘটনার তথ্য বন বিভাগের কাছে নেই।
অন্যদিকে, বিভিন্ন সময়ে বাঘের আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৪২৫ জন বনজীবী। তবে আশার কথা হলো, ২০২৪ সালের পর সুন্দরবনে আর কোনো বাঘ মারা পড়েনি।
বন বিভাগ যা বলছে
বাগেরহাটের পূর্ব সুন্দরবন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন সুন্দরবনের বাঘ বেশি নিরাপদ। ২০২৪ সালের পর সুন্দরবনে আর কোনো বাঘ মারা পড়েনি।
তিনি বলেন, বাঘের আবাসস্থল নিরাপদ রাখতে নানা পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে। চোরাশিকারিদের আটক, ড্রোনসহ আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্মার্ট পেট্রলিং এবং প্রতিদিন পায়ে হেঁটে টহল চালু রয়েছে।
প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও জলোচ্ছ্বাসের সময় বাঘ ও বন্যপ্রাণীদের আশ্রয়ের জন্য বিভিন্ন স্থানে মাটির উঁচু টিলাসহ (কেল্লা) আশ্রয়স্থল তৈরি করা হয়েছে। বন্যপ্রাণীদের সুপেয় পানির জন্য খনন করা হয়েছে পুকুর। বাঘ যাতে লোকালয়ে ঢুকতে না পারে, সে জন্য ৭৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়া নির্মাণ করা হয়েছে।
বন্যপ্রাণী শিকারের সম্ভাবনা রয়েছে—এমন ২৫টি হটস্পট চিহ্নিত করে ক্যামেরা ট্র্যাপের মাধ্যমে মনিটরিং করা হচ্ছে। বাঘের প্রজনন মৌসুমে জুন, জুলাই ও আগস্ট—এই তিন মাস সুন্দরবনে পর্যটক এবং জেলে-বাওয়ালিদের প্রবেশ বন্ধ রাখা হচ্ছে।